২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক পারমিট: নতুন নিয়ম ও বিদেশিদের আবেদন প্রক্রিয়া

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের জন্য ২০২৫ সালের ওয়ার্ক পারমিট গাইড

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক পারমিট কাজ করতে আগ্রহী বিদেশিদের জন্য Employment Authorization Document (EAD) বা ওয়ার্ক পারমিটের নিয়মে বড় ধরনের পরিবর্তন এসেছে। মার্কিন অভিবাসন দফতর (USCIS) নতুন নীতিমালায় ডিজিটাল আবেদন প্রক্রিয়া, দ্রুত অনুমোদন এবং নির্দিষ্ট পেশার জন্য অগ্রাধিকার সুবিধা চালু করেছে। যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করতে হলে এই ওয়ার্ক পারমিট অপরিহার্য। আজকের আলোচনায় জানব – ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক পারমিট নতুন নিয়ম, কারা আবেদন করতে পারবেন, আবেদন প্রক্রিয়া কেমন, ও গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ।

প্রথমে বুঝে নিই, ওয়ার্ক পারমিট কী


ওয়ার্ক পারমিট (Employment Authorization Document বা EAD) হলো এমন একটি অফিসিয়াল কার্ড যা যুক্তরাষ্ট্রের অভিবাসন দফতর (USCIS) প্রদান করে, যাতে কোনো বিদেশি নাগরিক বৈধভাবে মার্কিন মাটিতে চাকরি করতে পারেন। এই কার্ডটি সাধারণত এক বছরের জন্য কার্যকর থাকে, এবং সময় শেষে নবায়ন করতে হয়। যারা আশ্রয়প্রার্থী (asylum seekers), শিক্ষার্থী (student visa holders), বা কোনো অস্থায়ী ভিসায় যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থান করছেন, তারাই মূলত এই অনুমতির জন্য যোগ্য হতে পারেন।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক পারমিটনতুন নিয়ম ও পরিবর্তনসমূহ

১. অনলাইন আবেদন বাধ্যতামূলক
আগে যেমন আবেদনকারীরা ডাকযোগে বা কাগজপত্র পাঠিয়ে আবেদন করতেন, এখন থেকে সব আবেদন অনলাইনে করতে হবে। USCIS পোর্টালের মাধ্যমে Form I-765 পূরণ করে প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট আপলোড করতে হবে। এই ডিজিটাল সিস্টেমের ফলে প্রক্রিয়া হবে দ্রুত ও সহজ, পাশাপাশি জালিয়াতির ঝুঁকিও কমবে।

২. প্রক্রিয়াকরণ সময় কমেছে
নতুন নীতিমালায় নির্দিষ্ট কিছু পেশার (বিশেষ করে স্বাস্থ্যসেবা, প্রযুক্তি, ও গবেষণায় যুক্ত ব্যক্তিরা) জন্য ‘expedited processing’ সুবিধা দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে ৩০ দিনের মধ্যেই আবেদন প্রক্রিয়া সম্পন্ন হওয়ার সম্ভাবনা থাকবে, যা আগে ৩–৫ মাস পর্যন্ত লাগত।

৩. বায়োমেট্রিক যাচাই কঠোর
২০২৫ সালে নতুন নিরাপত্তা ব্যবস্থা যুক্ত হয়েছে। আবেদনকারীর ফিঙ্গারপ্রিন্ট, ছবি, ও ব্যাকগ্রাউন্ড চেক আরও বিস্তারিতভাবে যাচাই করা হবে। এর ফলে ভুয়া আবেদন প্রতিরোধ ও কর্মসংস্থান নিরাপত্তা নিশ্চিত হবে।

৪. স্বয়ংক্রিয় নবায়ন (Automatic Renewal)
যাদের ওয়ার্ক পারমিট মেয়াদ শেষের পথে, তারা যদি নবায়নের আবেদন সময়মতো করেন, তবে নতুন নীতিমালায় স্বয়ংক্রিয়ভাবে ১৮০ দিন অতিরিক্ত মেয়াদ পাবেন। এর ফলে চাকরি বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঝুঁকি অনেকটা কমে যাবে।

৫. STEM পেশায় অগ্রাধিকার
২০২৫ সাল থেকে বিজ্ঞান, প্রযুক্তি, ইঞ্জিনিয়ারিং ও গণিত (STEM) সংশ্লিষ্ট ক্ষেত্রের বিদেশিদের জন্য বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে। এই পেশার আবেদনকারীরা দ্রুত অনুমোদন ও দীর্ঘ মেয়াদি কাজের সুযোগ পাবেন।

কারা যুক্তরাষ্ট্রে ওয়ার্ক পারমিটের জন্য আবেদন করতে পারবেন

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের জন্য ২০২৫ সালের ওয়ার্ক পারমিট গাইড
নিউ ইয়োর্ক সিটি
  • যারা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে অবস্থান করছেন (যেমন – ছাত্র, আশ্রয়প্রার্থী, বা নির্দিষ্ট ভিসাধারী)।
  • যাদের নিয়োগকর্তা (Employer) যুক্তরাষ্ট্রে নিবন্ধিত এবং স্পনসর করতে আগ্রহী।
  • যাদের ভিসা টাইপ অনুযায়ী কাজের অনুমতি রয়েছে (যেমন L-2, H-4, F-1 OPT, ইত্যাদি)।
  • যারা Humanitarian বা Temporary Protected Status (TPS) প্রাপ্ত।

ওয়ার্ক পারমিটের জন্য প্রয়োজনীয় ডকুমেন্টসমূহ

১. পূর্ণাঙ্গ Form I-765
২. বৈধ পাসপোর্টের কপি
৩. I-94 আগমন ও প্রস্থান রেকর্ড
৪. ভিসা বা স্ট্যাটাস সংক্রান্ত প্রমাণপত্র
৫. সাম্প্রতিক দুই কপি ছবি (২x২ ইঞ্চি)
৬. প্রযোজ্য ক্ষেত্রে স্পনসরশিপ লেটার
৭. আবেদন ফি (প্রায় $520, তবে পরিবর্তন হতে পারে)

আবেদন প্রক্রিয়া (Step-by-Step)

ধাপ ১: USCIS ওয়েবসাইটে গিয়ে একটি অ্যাকাউন্ট তৈরি করুন।
ধাপ ২: Form I-765 পূরণ করুন এবং সঠিক তথ্য দিন।
ধাপ ৩: প্রয়োজনীয় ডকুমেন্ট ও ছবি আপলোড করুন।
ধাপ ৪: অনলাইন পেমেন্টের মাধ্যমে আবেদন ফি পরিশোধ করুন।
ধাপ ৫: আবেদন জমা দেওয়ার পর বায়োমেট্রিক অ্যাপয়েন্টমেন্টের জন্য ইমেইল নোটিফিকেশন পাবেন।
ধাপ ৬: বায়োমেট্রিক সম্পন্ন হলে USCIS আবেদন পর্যালোচনা করবে এবং অনুমোদিত হলে ডাকযোগে আপনার EAD কার্ড পাঠাবে।

EAD কার্ডের বৈধতা ও নবায়ন

সাধারণত যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক পারমিট এক বছরের জন্য বৈধ থাকে। কিছু ক্ষেত্রে (যেমন আশ্রয় আবেদনকারী বা TPS প্রাপ্তদের জন্য) মেয়াদ দীর্ঘ হতে পারে। মেয়াদ শেষ হওয়ার অন্তত ৬ মাস আগে নবায়নের জন্য আবেদন করাই উত্তম। নতুন নীতিতে স্বয়ংক্রিয় নবায়নের সুযোগ থাকলেও, সময়মতো আবেদন করা জরুরি।

কাজের অনুমতি পাওয়ার পর গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো

  • ২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক পারমিট থাকলেই আপনি যেকোনো চাকরি করতে পারবেন না। আপনার ভিসা বা স্ট্যাটাস অনুযায়ী কিছু সীমাবদ্ধতা থাকতে পারে।
  • চাকরি পরিবর্তনের ক্ষেত্রে নতুন নিয়োগকর্তা যদি স্পনসর হয়ে থাকে, তবে তার তথ্য USCIS-এ আপডেট করতে হবে।
  • অনুমোদন ছাড়া কাজ শুরু করলে তা ইমিগ্রেশন আইনের লঙ্ঘন হিসেবে গণ্য হবে এবং ভবিষ্যতে ভিসা বা গ্রিন কার্ড পাওয়ায় বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
  • ওয়ার্ক পারমিট হারালে বা নষ্ট হলে, পুনরায় আবেদন করে রিপ্লেসমেন্ট কার্ড পাওয়া সম্ভব।

২০২৫ সালে বিশেষ নজর দেওয়া হচ্ছে এই সেক্টরগুলোতে

১. হেলথকেয়ার ও নার্সিং
২. ইনফরমেশন টেকনোলজি (IT)
৩. ইঞ্জিনিয়ারিং ও কনস্ট্রাকশন
৪. এডুকেশন ও রিসার্চ
৫. ট্রাক ড্রাইভিং, লজিস্টিকস ও সাপ্লাই চেইন

এই ক্ষেত্রগুলিতে শ্রমিকের ঘাটতি থাকায় বিদেশিদের জন্য চাকরির সুযোগ বেশি এবং EAD অনুমোদনও তুলনামূলক দ্রুত হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্রে বিদেশিদের জন্য ২০২৫ সালের ওয়ার্ক পারমিট গাইড
শিকাগো শহর

বিদেশিদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শ

১. শুধুমাত্র অফিসিয়াল USCIS ওয়েবসাইট (https://www.uscis.gov) থেকে ফর্ম ডাউনলোড করুন ও তথ্য যাচাই করুন।
২. কোনো এজেন্ট বা মধ্যস্থতাকারীর কাছে টাকা না দিয়ে সরাসরি নিজে আবেদন করুন।
৩. মিথ্যা বা ভুল তথ্য দিলে স্থায়ী নিষেধাজ্ঞা আসতে পারে।
৪. আবেদন করার আগে আপনার ভিসা স্ট্যাটাস ভালোভাবে যাচাই করুন।
৫. চাকরি পাওয়ার পর নিয়োগকর্তার কাছ থেকে বৈধ ট্যাক্স রেকর্ড ও পে-স্টাব সংগ্রহ করুন — ভবিষ্যতের ইমিগ্রেশন প্রক্রিয়ায় এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

২০২৫ সালের এই নতুন নীতির প্রভাব

নতুন ডিজিটাল ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার কারণে এখন ওয়ার্ক পারমিট পাওয়া আগের চেয়ে সহজ হলেও প্রক্রিয়াটি আরও স্বচ্ছ ও নিয়মবদ্ধ হয়েছে। ভুয়া আবেদন ও অবৈধ কাজের প্রবণতা কমাতে মার্কিন প্রশাসন কঠোর হয়েছে। ফলে যারা যোগ্য, নিয়ম মেনে আবেদন করছেন, তাদের জন্য সুযোগ আগের চেয়ে অনেক বেশি।

২০২৫ সালে যুক্তরাষ্ট্রের ওয়ার্ক পারমিট নীতিতে আসা পরিবর্তনগুলো বিদেশিদের জন্য সুযোগ ও চ্যালেঞ্জ – দুই-ই এনেছে। অনলাইনে আবেদন ও দ্রুত প্রসেসিং সুবিধা কর্মজীবীদের জন্য আশার আলো হলেও নিরাপত্তা যাচাইয়ের কড়াকড়ি আরও বেড়েছে। তাই যারা যুক্তরাষ্ট্রে বৈধভাবে কাজ করতে চান, তাদের উচিত আগেভাগে প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত রাখা, সঠিকভাবে ফর্ম পূরণ করা এবং নিয়ম অনুযায়ী আবেদন করা। সঠিক পথে আবেদন করলে যুক্তরাষ্ট্রে কর্মসংস্থানের দুয়ার এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি উন্মুক্ত।

এই তথ্যটি ExpatBangla.com দ্বারা প্রস্তুত — প্রবাসীদের জন্য ইউরোপ ও আমেরিকার আইন, ভিসা, ওয়ার্ক পারমিট ও জীবনযাপন সংক্রান্ত নির্ভরযোগ্য উৎস।

Leave a Comment

Your email address will not be published. Required fields are marked *