
সৌদি আরবে অবৈধ প্রবাসী গ্রেফতার কার্যক্রম আরও কঠোর করা হয়েছে। সৌদি নিরাপত্তা কর্তৃপক্ষ এক সপ্তাহের মধ্যে মোট ২২,৬১৩ জন অবৈধ প্রবাসীকে গ্রেফতার করেছে। এই অভিযান পরিচালনা করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তত্ত্বাবধানে দেশব্যাপী বিভিন্ন প্রদেশে পুলিশ, শ্রম মন্ত্রণালয় এবং পাসপোর্ট বিভাগের যৌথ টিম।
সৌদি গৃহ মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গ্রেফতারকৃতদের মধ্যে রয়েছে ভিসা মেয়াদোত্তীর্ণ শ্রমিক, পলাতক কর্মী, ও আইনি কাগজপত্রবিহীন প্রবেশকারীরা। এছাড়া, অনেক স্থানীয় নাগরিকের বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে, যারা অবৈধ প্রবাসীদের আশ্রয়, পরিবহন বা চাকরি দিয়েছেন।
সৌদি আরবে অবৈধ প্রবাসী গ্রেফতার অভিযানের মূল উদ্দেশ্য
সৌদি সরকার দীর্ঘদিন ধরে “নিরাপদ সমাজ ও সুশৃঙ্খল শ্রমবাজার” গড়ে তোলার লক্ষ্যে অবৈধ বিদেশিদের শনাক্ত ও বহিষ্কারে সচেষ্ট। এই সপ্তাহের অভিযান ছিল ‘Nationwide Security Campaign’-এর অংশ, যা ২০২৫ সালের প্রথম প্রান্তিক থেকেই চলমান।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, অবৈধভাবে বসবাসকারীদের কারণে শ্রমবাজারে ভারসাম্য নষ্ট হয়, স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থানে প্রভাব পড়ে এবং অপরাধ প্রবণতা বাড়ে। তাই নিয়মিত অভিযান চালিয়ে সৌদি আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এসব অপরাধ প্রতিরোধে কাজ করছে।
কারা গ্রেফতার হয়েছেন
মোট ২২,৬১৩ জনের মধ্যে ১৪,০০০ জন ছিলেন আবাসন ও শ্রম আইনের লঙ্ঘনকারী, প্রায় ৫,৮০০ জন অবৈধভাবে সীমান্ত অতিক্রমের দায়ে ধরা পড়েছেন এবং বাকিরা কাজের অনুমতি ছাড়াই বিভিন্ন বেসরকারি খাতে নিযুক্ত ছিলেন।
পাশাপাশি প্রায় ৩৫ জন সৌদি নাগরিককেও আটক করা হয়েছে, যারা এসব অবৈধ প্রবাসীদের আশ্রয় বা সহযোগিতা করছিলেন। গৃহ মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এসব নাগরিকদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
শাস্তি ও আইনি ব্যবস্থা

সৌদি আরবে অবৈধভাবে বসবাস বা কর্মরত বিদেশিদের জন্য শাস্তির বিধান অত্যন্ত কঠোর।
১. ৫০,০০০ রিয়াল পর্যন্ত জরিমানা
২. ৬ মাস পর্যন্ত কারাদণ্ড
৩. নির্বাসন (Deportation)
৪. পুনরায় সৌদি আরবে প্রবেশে আজীবন নিষেধাজ্ঞা
যেসব সৌদি নাগরিক বা কোম্পানি অবৈধ প্রবাসীদের সহায়তা করে, তাদের ক্ষেত্রেও একইভাবে জরিমানা, ব্যবসা বন্ধ ও কারাদণ্ডের শাস্তি হতে পারে।
২০২৫ সালের নতুন শ্রমনীতি ও ইমিগ্রেশন নিয়ম
নতুন শ্রমনীতি অনুযায়ী, বিদেশিদের অবশ্যই তাদের “Iqama” বা রেসিডেন্স পারমিট বৈধ রাখতে হবে। এছাড়া, যারা চাকরি পরিবর্তন বা নিয়োগদাতা বদল করতে চান, তাদের জন্য “Qiwa” সিস্টেমে অনুমোদন নেওয়া বাধ্যতামূলক।
সৌদি আরবে অবৈধ প্রবাসী গ্রেফতার করার জন্য এখন উন্নত ডিজিটাল ট্র্যাকিং, বায়োমেট্রিক ডেটা ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) প্রযুক্তি ব্যবহার করছে। ফলে পালিয়ে থাকা বা অবৈধভাবে বসবাস করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ছে।
সরকারি সতর্কতা
গৃহ মন্ত্রণালয় সবাইকে সতর্ক করে বলেছে, কোনো অবস্থাতেই অবৈধ প্রবাসীদের সহায়তা করা যাবে না। যদি কেউ আশ্রয় দেয়, ভাড়া বাড়ি দেয় বা পরিবহন সহযোগিতা করে, তাহলে সেটিও অপরাধ বলে গণ্য হবে।
একই সঙ্গে, যাদের রেসিডেন্স পারমিট (Iqama) মেয়াদোত্তীর্ণ হয়েছে বা কাজের অনুমতি নেই, তাদেরকে দ্রুত আইনি প্রক্রিয়া অনুসরণ করে বৈধ অবস্থায় ফিরে আসার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য বার্তা
সৌদি আরবে বর্তমানে প্রায় ২৫ লক্ষাধিক বাংলাদেশি প্রবাসী কাজ করছেন। বাংলাদেশ দূতাবাস ইতোমধ্যে একটি বিবৃতি দিয়ে জানিয়েছে, বৈধ কাগজপত্রবিহীন কেউ যেন বাইরে না বের হয় এবং অবিলম্বে নিজেদের আইনি অবস্থান ঠিক করে নেয়।
দূতাবাস থেকে আরও জানানো হয়, যারা সমস্যায় আছেন তারা জেদ্দা, রিয়াদ ও দাম্মাম কনস্যুলেটে যোগাযোগ করে সাহায্য নিতে পারেন।
সৌদি আরবের শ্রমনীতি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
সৌদি সরকার “Vision 2030”-এর অংশ হিসেবে স্থানীয় শ্রমবাজারকে উন্নত করতে কাজ করছে। এজন্য বিদেশি কর্মীদের সংখ্যা নিয়ন্ত্রণ ও অবৈধ প্রবাসীদের বহিষ্কার একটি নিয়মিত প্রক্রিয়া হিসেবে চালু রাখা হয়েছে।
নতুন নীতিমালায় দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার দেওয়া হচ্ছে এবং সৌদি নাগরিকদের জন্য নতুন চাকরি সৃষ্টি করা হচ্ছে।
সচেতনতার আহ্বান
প্রবাসী বাংলাদেশি ও অন্যান্য দেশের নাগরিকদের প্রতি আহ্বান জানানো হয়েছে, তারা যেন সর্বদা তাদের আইনি কাগজপত্র নবায়ন করেন এবং কোনো অবস্থাতেই অবৈধভাবে কাজ না করেন। এতে নিজের নিরাপত্তা যেমন নিশ্চিত হয়, তেমনি ভবিষ্যতে সৌদি আরবে পুনরায় কাজ করার সুযোগও বজায় থাকে।
এই অভিযান প্রমাণ করে যে সৌদি আরব এখন অবৈধ প্রবাসীদের বিষয়ে কোনো ছাড় দিচ্ছে না। যারা এখনো বৈধতা হারিয়েছেন, তারা যেন দ্রুত তাদের কাগজপত্র নবায়ন করে নেয় বা দূতাবাসের মাধ্যমে দেশে ফেরার প্রক্রিয়া সম্পন্ন করেন।
দেশে থাকা পরিবার ও নিজের ভবিষ্যতের নিরাপত্তার জন্য আইন মেনে চলাই সবচেয়ে বড় বুদ্ধিমত্তা।


