
সৌদি আরবে চাকরি খোঁজা এখন অনেক সহজ হয়েছে, বিশেষ করে প্রবাসীদের জন্য। সরকারি পোর্টাল Saudi Ministry of Human Resources ও বেসরকারি চাকরি সাইট Bayt.com-এ নিবন্ধন করে আপনি বিভিন্ন সেক্টরে চাকরির সুযোগ দেখতে পারেন। কাজের ভিসা পেতে হলে অবশ্যই অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করা উচিত। সঠিক তথ্য যাচাই করে এগোলে আপনি নিরাপদে সৌদি আরবে ক্যারিয়ার গড়তে পারেন।
সৌদি আরবের শ্রমবাজারের অবস্থা
সৌদি আরবের শ্রমবাজার বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যের অন্যতম বড় কর্মক্ষেত্র, যেখানে বিদেশি শ্রমিকদের জন্য সুযোগ এখনও বেশ বিস্তৃত। বিশেষ করে বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান ও ফিলিপাইন থেকে প্রতিনিয়ত শ্রমিকরা সৌদি আরবে চাকরি পেয়ে যাচ্ছেন। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সৌদি সরকার স্থানীয় নাগরিকদের কর্মসংস্থান বাড়াতে ‘সৌদিকরণ’ (Saudization) নীতিমালা কঠোরভাবে বাস্তবায়ন করছে, যার ফলে কিছু খাতে বিদেশি শ্রমিকদের নিয়োগ সীমিত করা হচ্ছে।
যারা সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া নিয়ে ভাবছেন, তাদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ হলো বর্তমান বাজারের চাহিদা জানা। যেমন— নির্মাণ, স্বাস্থ্যসেবা, হোটেল ও রেস্টুরেন্ট, আইটি, পরিবহন, এবং ক্লিনিং সার্ভিস খাতে বিদেশিদের চাহিদা এখনও খুব বেশি।
সর্বশেষ শ্রমবাজারের আপডেট ও বৈধ নিয়োগ সংক্রান্ত তথ্য জানতে সৌদি মানবসম্পদ ও সামাজিক উন্নয়ন মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইটে (https://www.mhrsd.gov.sa) ভিজিট করা যেতে পারে। এছাড়াও প্রবাসীদের জন্য সৌদি সরকারের অফিসিয়াল পোর্টাল Absher.sa এবং বাংলাদেশ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট https://probashi.gov.bd–তে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাওয়া যায়।
সৌদি আরবে চাকরি খোঁজার উপায়
সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া এখন অনেক সহজ হয়েছে যদি সঠিক উৎস ও বৈধ প্রক্রিয়া অনুসরণ করা যায়। যারা প্রবাসে কাজ করতে চান, তাদের প্রথমে জানতে হবে কোথায় এবং কীভাবে বৈধভাবে চাকরি খোঁজা যায়। নিচে কিছু নির্ভরযোগ্য উপায় দেওয়া হলো, যেগুলোর মাধ্যমে আপনি সহজে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া প্রক্রিয়া শুরু করতে পারেন।
১. বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সি:
বাংলাদেশের প্রবাসীকল্যাণ ও বৈদেশিক কর্মসংস্থান মন্ত্রণালয়ের ওয়েবসাইট (https://www.probashi.gov.bd)–এ গিয়ে বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির তালিকা পাওয়া যায়। এই সংস্থাগুলোর মাধ্যমে সৌদি আরবে বিভিন্ন খাতে চাকরির আবেদন করা সবচেয়ে নিরাপদ উপায়।
২. সৌদি আরবের অনলাইন জব পোর্টাল:
সৌদি সরকারের অনুমোদিত কয়েকটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সরাসরি চাকরির আবেদন করা যায়। যেমন:
- https://www.taqat.sa — সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের অফিসিয়াল জব পোর্টাল।
- https://www.bayt.com — মধ্যপ্রাচ্যের জনপ্রিয় জব সাইট।
- https://www.linkedin.com — প্রফেশনাল নেটওয়ার্কিং প্ল্যাটফর্ম, যেখানে অনেক সৌদি কোম্পানি সরাসরি নিয়োগ দেয়।
৩. Absher ও Qiwa প্ল্যাটফর্ম:
সৌদি আরবে বৈধভাবে কাজ করতে হলে আপনার আইডি ও ভিসা সম্পর্কিত তথ্য Absher (https://www.absher.sa) প্ল্যাটফর্মে থাকতে হয়। একইভাবে, চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠানকে Qiwa (https://www.qiwa.sa) প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধিত থাকতে হবে। এই দুটি সাইটে প্রোফাইল তৈরি ও তথ্য যাচাই করা আপনার চাকরি প্রক্রিয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ ধাপ।
৪. দূতাবাস বা বাংলাদেশ ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অফিস:
ঢাকা, চট্টগ্রাম ও অন্যান্য অঞ্চলের ওভারসিজ এমপ্লয়মেন্ট অফিসে সৌদি আরবে বৈধ চাকরির বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়। আপনি চাইলে তাদের অফিসে সরাসরি যোগাযোগ করতে পারেন।
সর্বদা মনে রাখবেন, সৌদি আরবে চাকরি পাওয়ার আগে কোনো মধ্যস্বত্বভোগী বা ভুয়া এজেন্সির মাধ্যমে অর্থ লেনদেন না করে সরকারি অনুমোদিত চ্যানেলই অনুসরণ করা উচিত।
সৌদি আরবে চাকরির জন্য আবেদন প্রক্রিয়া
সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া শুধু আগ্রহের বিষয় নয়, এটি একটি নির্দিষ্ট ও বৈধ প্রক্রিয়ার অংশ। যারা নিরাপদ ও বৈধ উপায়ে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া নিশ্চিত করতে চান, তাদের নিচের ধাপগুলো সঠিকভাবে অনুসরণ করা জরুরি।
১. চাকরির বিজ্ঞপ্তি যাচাই:
প্রথমে সৌদি আরবের সরকারি জব পোর্টাল যেমন Taqat.sa অথবা আন্তর্জাতিক সাইট Bayt.com–এ গিয়ে আপনার দক্ষতা অনুযায়ী চাকরি খুঁজে নিন। একইসাথে বাংলাদেশ সরকারের অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির ওয়েবসাইট probashi.gov.bd–এ বৈধ নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি পাওয়া যায়।
২. বৈধ পাসপোর্ট ও প্রয়োজনীয় কাগজপত্র প্রস্তুত করা:
চাকরির আবেদন করার আগে নিশ্চিত করুন আপনার পাসপোর্ট কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ আছে। এছাড়া শিক্ষাগত সনদ, কাজের অভিজ্ঞতার প্রমাণপত্র ও ছবি প্রস্তুত রাখুন।
৩. রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন:
বৈধ রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন করাই সবচেয়ে নিরাপদ। এজেন্সিগুলো চাকরির কাগজ যাচাই, চুক্তিপত্র তৈরি, এবং ভিসা প্রসেসিং–এর পুরো প্রক্রিয়া সম্পন্ন করে। কখনোই অবৈধ দালাল বা অজানা ব্যক্তির কাছে টাকা পরিশোধ করবেন না।
৪. চাকরির চুক্তিপত্র (Employment Contract):
আপনার নির্বাচিত নিয়োগকর্তা একটি চাকরির চুক্তিপত্র পাঠাবে যেখানে কাজের ধরণ, বেতন, ছুটি ও অন্যান্য সুবিধা উল্লেখ থাকবে। এই চুক্তি ভালোভাবে পড়ে বুঝে স্বাক্ষর করা উচিত। প্রয়োজনে বাংলাদেশ প্রবাসীকল্যাণ মন্ত্রণালয় বা দূতাবাসের সাহায্য নিতে পারেন।
৫. ভিসা ও মেডিকেল পরীক্ষা:
চাকরি অনুমোদনের পর সৌদি দূতাবাস থেকে কাজের ভিসা নিতে হয়। ভিসা প্রসেসিংয়ের আগে অবশ্যই GAMCA অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টারে স্বাস্থ্য পরীক্ষা করাতে হয় (তথ্য: https://gcchmc.org)।
৬. ফ্লাইট ও আগমন:
সবশেষে, এজেন্সি বা নিয়োগকর্তা ফ্লাইটের ব্যবস্থা করে। সৌদি পৌঁছে আপনার আইডি (Iqama) ও অন্যান্য তথ্য Absher.sa–তে নিবন্ধন করতে হবে।
এই ধাপগুলো অনুসরণ করলে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া প্রক্রিয়া হয় বৈধ, নিরাপদ ও নির্ভরযোগ্য।
সৌদি আরবে ওয়ার্ক ভিসার জন্য আবেদন
সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া এবং সেখানে বৈধভাবে কাজ করার জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো ওয়ার্ক ভিসা বা কাজের ভিসা সংগ্রহ করা। অনেকেই চাকরি পেয়ে যান, কিন্তু ভিসা প্রক্রিয়ায় ভুল করার কারণে সমস্যায় পড়েন। নিচে ধাপে ধাপে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া-এর পর ওয়ার্ক ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াটি বিস্তারিতভাবে দেওয়া হলো।
১. নিয়োগপত্র (Job Offer) নিশ্চিত করা:
ওয়ার্ক ভিসার জন্য আবেদন করার আগে সৌদি আরবের কোনো কোম্পানি বা নিয়োগকর্তার কাছ থেকে বৈধ নিয়োগপত্র পাওয়া আবশ্যক। চুক্তিপত্রে আপনার পদবি, বেতন, কাজের সময় ও অন্যান্য সুবিধা স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে।
২. রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে আবেদন জমা:
বাংলাদেশে অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমেই সৌদি ওয়ার্ক ভিসা প্রক্রিয়া শুরু হয়। বৈধ এজেন্সির তালিকা পাওয়া যাবে https://www.probashi.gov.bd ওয়েবসাইটে। এজেন্সি আপনার কাগজপত্র যাচাই করে সৌদি দূতাবাসে ভিসা আবেদন পাঠায়।
৩. ভিসা অনুমোদন নম্বর (Visa Authorization Number):
চাকরিদাতা প্রতিষ্ঠান সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয়ের সিস্টেমে (https://www.qiwa.sa) আপনার নামে একটি ভিসা অনুমোদন নম্বর তৈরি করবে। এটি ছাড়া ভিসা আবেদন সম্ভব নয়।
৪. প্রয়োজনীয় কাগজপত্র:
ওয়ার্ক ভিসা আবেদনের জন্য নিচের কাগজপত্রগুলো লাগবে:
- বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাস মেয়াদ থাকতে হবে)
- নিয়োগপত্র ও চাকরির চুক্তিপত্র
- মেডিকেল রিপোর্ট (GAMCA অনুমোদিত মেডিকেল সেন্টার থেকে – https://gcchmc.org)
- ছবি (সাদা ব্যাকগ্রাউন্ডে পাসপোর্ট সাইজ)
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট
- শিক্ষাগত যোগ্যতা ও অভিজ্ঞতার কাগজপত্র
৫. সৌদি দূতাবাসে ভিসা স্ট্যাম্পিং:
সব নথি যাচাইয়ের পর সৌদি দূতাবাস বা অনুমোদিত ভিসা সেন্টারে ভিসা স্ট্যাম্প করা হয়। এই পর্যায়ে সাধারণত নিয়োগকর্তা বা এজেন্সি সব আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন করে।
৬. Absher প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন:
ভিসা অনুমোদনের পর সৌদিতে পৌঁছে আপনার ওয়ার্ক আইডি (Iqama) ও অন্যান্য তথ্য Absher.sa–তে রেজিস্টার করতে হবে। এটি আপনার পরিচয়পত্র ও কাজের বৈধতার প্রধান প্রমাণ।
এই ধাপগুলো সম্পন্ন করলে আপনি বৈধভাবে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া ও কাজ শুরু করার সম্পূর্ণ প্রস্তুতি নিতে পারবেন।
সৌদি আরবে কাজ করার সুবিধা
সৌদি আরব দীর্ঘদিন ধরে প্রবাসীদের অন্যতম প্রিয় গন্তব্য, বিশেষ করে বাংলাদেশের শ্রমিক ও পেশাজীবীদের জন্য। মধ্যপ্রাচ্যের এই দেশটি শুধু উচ্চ আয়ের সুযোগ নয়, বরং নিরাপদ কর্মপরিবেশ ও উন্নত জীবনযাত্রার প্রতিশ্রুতি দেয়। নিচে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া ও সেখানে কাজ করার কিছু প্রধান সুবিধা তুলে ধরা হলো।
১. করমুক্ত আয় (Tax-Free Income):
সৌদি আরবে ব্যক্তিগত আয়ের উপর কোনো ইনকাম ট্যাক্স নেই। অর্থাৎ আপনি যে বেতন পাবেন, তার পুরোটা নিজের হিসেবে রাখতে পারবেন। এটি প্রবাসীদের জন্য সবচেয়ে বড় আর্থিক সুবিধা।
২. বিনামূল্যে থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা:
অনেক নিয়োগকর্তা কর্মীদের জন্য ফ্রি আবাসন, পরিবহন ও খাবারের ব্যবস্থা করে থাকে। ফলে মাসিক খরচ অনেক কমে যায়, যা সঞ্চয়ের সুযোগ বাড়ায়।
৩. বৈধভাবে দীর্ঘমেয়াদি কাজের সুযোগ:
যারা বৈধভাবে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়ার পর কাজ শুরু করেন, তারা ২ বছর বা তার বেশি মেয়াদের রেসিডেন্স পারমিট (ইকামা) পান। এটি নবায়নযোগ্য, ফলে দীর্ঘমেয়াদে চাকরি স্থায়ী করা সম্ভব।
৪. নিরাপদ ও ইসলামিক পরিবেশ:
সৌদি আরবে জীবনযাত্রা ইসলামিক আইন অনুযায়ী পরিচালিত হয়। মুসলমানদের জন্য এটি ধর্মীয়ভাবে একটি স্বস্তিদায়ক ও নিরাপদ কর্মপরিবেশ তৈরি করে।
৫. আধুনিক স্বাস্থ্যসেবা ও বীমা সুবিধা:
সৌদি সরকার সব কর্মীদের জন্য বাধ্যতামূলক হেলথ ইন্স্যুরেন্স চালু করেছে। ফলে আপনি ও আপনার পরিবার চিকিৎসা ক্ষেত্রে নিশ্চিন্ত থাকতে পারবেন।
৬. পরিবার নিয়ে থাকার সুযোগ (Family Visa):
নির্দিষ্ট পেশা ও বেতনের মান পূরণ করলে প্রবাসীরা পরিবারকে সৌদিতে নিয়ে আসতে পারেন। এটি দীর্ঘমেয়াদি স্থিতিশীল জীবনের জন্য বড় সুবিধা।
৭. বোনাস ও বার্ষিক ছুটি:
বেশিরভাগ কোম্পানি বার্ষিক বোনাস, ছুটি ও বছরে একবার নিজ দেশে যাতায়াতের বিমান ভাড়া প্রদান করে থাকে।
সৌদি আরবে এইসব সুযোগের কারণে প্রতি বছর লাখ লাখ প্রবাসী বৈধ উপায়ে কাজের উদ্দেশ্যে দেশটিতে যাচ্ছেন। তাই সঠিক প্রক্রিয়া অনুসরণ করে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া এখন শুধু সম্ভাবনাই নয়, বাস্তব সুযোগও বটে।
সৌদি আরবে কর্মঘণ্টা, সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটি
সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া ও কাজ শুরু করার পর প্রতিটি প্রবাসীর জানা জরুরি বিষয় হলো—কাজের সময়, সাপ্তাহিক ছুটি ও সরকারি ছুটির নিয়ম। সৌদি শ্রম আইন অনুযায়ী এসব নিয়ম স্পষ্টভাবে নির্ধারিত, যাতে কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়ের অধিকার সংরক্ষিত থাকে। নিচে বিস্তারিতভাবে আলোচনা করা হলো।
১. দৈনিক ও সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা:
সৌদি শ্রম আইনের (Saudi Labor Law, Article 98) অনুযায়ী, সাধারণ কর্মীদের জন্য দৈনিক কর্মঘণ্টা সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা এবং সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা সর্বোচ্চ ৪৮ ঘণ্টা নির্ধারিত।
রমজান মাসে মুসলিম কর্মীদের জন্য এই সময় কমিয়ে ৬ ঘণ্টা প্রতিদিন করা হয়। যারা সৌদি আরবে চাকরি পাওয়ার পর কাজ করছেন, তাদের নিয়োগকর্তা এই নিয়ম মেনে কাজের সময় নির্ধারণ করতে বাধ্য।
২. সাপ্তাহিক ছুটি:
সৌদি আরবে সাধারণত শুক্রবার সরকারি সাপ্তাহিক ছুটি। তবে কিছু বেসরকারি কোম্পানি শুক্রবারের পাশাপাশি শনিবারকেও ছুটি দেয়। সরকারি দপ্তর ও বড় প্রতিষ্ঠানগুলোতে সপ্তাহে দুই দিন ছুটি ক্রমান্বয়ে প্রচলিত হচ্ছে।
৩. ওভারটাইম (অতিরিক্ত কাজ):
যদি কোনো কর্মী দৈনিক ৮ ঘণ্টার বেশি কাজ করেন, তবে সেই সময়কে ওভারটাইম ধরা হয়। শ্রম আইনের নিয়ম অনুযায়ী ওভারটাইমের পারিশ্রমিক ঘণ্টাপ্রতি মূল বেতনের ১.৫ গুণ দিতে হয়। এটি শ্রম মন্ত্রণালয় (Ministry of Human Resources and Social Development) কর্তৃক নির্ধারিত ন্যূনতম নিয়ম।
তথ্যসূত্র: https://www.mhrsd.gov.sa
৪. সরকারি ছুটি (Public Holidays):
সৌদি আরবে সরকারি ছুটি সাধারণত ইসলামিক ক্যালেন্ডার অনুযায়ী ঘোষণা করা হয়। প্রধান সরকারি ছুটিগুলো হলো:
- ঈদুল ফিতর (প্রায় ৪–৫ দিন ছুটি)
- ঈদুল আজহা (প্রায় ৫ দিন ছুটি)
- সৌদি জাতীয় দিবস – ২৩ সেপ্টেম্বর
- প্রতিষ্ঠা দিবস – ২২ ফেব্রুয়ারি
কিছু কোম্পানি ছুটির সময় বেতনসহ ছুটি (Paid Leave) দেয়, যা চুক্তিপত্রে উল্লেখ থাকে।
৫. বার্ষিক ছুটি:
একটানা এক বছর চাকরির পর প্রত্যেক কর্মী অন্তত ২১ দিনের বেতনসহ বার্ষিক ছুটি পাওয়ার অধিকারী। পাঁচ বছর পূর্ণ হলে এটি ৩০ দিন পর্যন্ত বৃদ্ধি পায়।
সবমিলিয়ে, সৌদি আরবে শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মীদের অধিকার ও বিশ্রামের সময় সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত। তাই যারা বৈধভাবে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া শেষে সেখানে কাজ করছেন, তাদের উচিত নিজের চুক্তিপত্র ও শ্রম আইন সম্পর্কে সচেতন থাকা।
সৌদি আরবে কর্মচুক্তি (Employment Contract)
সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া এবং বৈধভাবে কাজ শুরু করার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ধাপ হলো কর্মচুক্তি বা এমপ্লয়মেন্ট কনট্রাক্ট। এটি নিয়োগকর্তা ও কর্মীর মধ্যে একটি আইনি সমঝোতা, যেখানে কাজের শর্ত, বেতন, দায়িত্ব ও সুবিধাসমূহ বিস্তারিতভাবে উল্লেখ থাকে। নিচে সৌদি শ্রম আইন অনুযায়ী কর্মচুক্তি সংক্রান্ত গুরুত্বপূর্ণ তথ্য তুলে ধরা হলো।
১. লিখিত চুক্তি বাধ্যতামূলক:
সৌদি আরবের শ্রম আইন (Article 52) অনুযায়ী প্রতিটি বিদেশি কর্মীর জন্য লিখিত চাকরির চুক্তি থাকা বাধ্যতামূলক। চুক্তি আরবি ভাষায় তৈরি হয়, তবে প্রয়োজনে ইংরেজি বা কর্মীর মাতৃভাষায় অনুবাদ সংযুক্ত করা যায়।
চুক্তির কপি কর্মী ও নিয়োগকর্তা উভয়ের কাছে থাকতে হবে।
২. চুক্তিতে উল্লেখযোগ্য বিষয়সমূহ:
একটি বৈধ কর্মচুক্তিতে সাধারণত নিচের বিষয়গুলো স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকে –
- নিয়োগকর্তা ও কর্মীর পূর্ণ নাম ও জাতীয়তা
- কাজের পদবি ও দায়িত্ব
- মাসিক বেতন ও অন্যান্য সুবিধা
- কাজের সময়, ছুটি ও সাপ্তাহিক বিশ্রাম
- চুক্তির মেয়াদ ও নবায়নের শর্ত
- ভিসা, ইকামা ও বিমা সংক্রান্ত দায়িত্ব
- চাকরি শেষ করার নিয়ম ও ক্ষতিপূরণের শর্ত
৩. চুক্তির মেয়াদ ও নবায়ন:
সাধারণত সৌদি আরবে বিদেশিদের কর্মচুক্তি এক বা দুই বছরের জন্য হয়। মেয়াদ শেষ হলে নিয়োগকর্তা চাইলে চুক্তি নবায়ন করতে পারে। কর্মীও চাইলে বৈধ উপায়ে অন্য প্রতিষ্ঠানে স্থানান্তর (transfer) করতে পারেন — এটি Qiwa.sa প্ল্যাটফর্মের মাধ্যমে সম্পন্ন হয়।
৪. চুক্তি বাতিলের শর্ত:
চুক্তির মেয়াদ শেষ হওয়ার আগে চাকরি ছাড়তে চাইলে বা নিয়োগকর্তা কাউকে বরখাস্ত করতে চাইলে শ্রম আইনের নির্দিষ্ট ধারা অনুযায়ী নোটিশ দিতে হয়। সাধারণত এক মাসের নোটিশ বাধ্যতামূলক। অন্যথায় ক্ষতিপূরণ দিতে হয়।
৫. Qiwa ও Absher প্ল্যাটফর্মে চুক্তি নিবন্ধন:
সৌদি শ্রম মন্ত্রণালয় এখন সব চাকরির চুক্তি ডিজিটালভাবে Qiwa.sa প্ল্যাটফর্মে নিবন্ধন বাধ্যতামূলক করেছে। কর্মী তার চুক্তির সত্যতা যাচাই করতে পারেন Qiwa বা Absher.sa অ্যাকাউন্টে লগইন করে। এটি প্রতারণা ও ভুয়া নিয়োগ এড়ানোর সবচেয়ে কার্যকর উপায়।
৬. চুক্তি সংক্রান্ত অভিযোগ:
যদি নিয়োগকর্তা চুক্তির শর্ত ভঙ্গ করে, কর্মী শ্রম মন্ত্রণালয়ের অভিযোগ সেন্টার (https://www.mhrsd.gov.sa)–এর মাধ্যমে অভিযোগ করতে পারেন। প্রবাসীরা চাইলে বাংলাদেশ দূতাবাসের শ্রম উইংয়ের সহায়তাও নিতে পারেন।
সঠিকভাবে তৈরি ও নিবন্ধিত কর্মচুক্তি আপনার বৈধতা, নিরাপত্তা ও অধিকারের নিশ্চয়তা দেয়। তাই যারা সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া শেষে কাজ শুরু করছেন, তাদের জন্য এটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ আইনি নথি।
সৌদি আরবে নারীদের কর্মসংস্থান
সৌদি আরবে নারীদের জন্য কর্মসংস্থানের সুযোগ গত কয়েক বছরে ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সরকারি নীতিমালা ও সংস্কারের কারণে এখন নারীরাও বিভিন্ন খাতে বৈধভাবে কাজ করতে পারছেন। যারা নারী প্রবাসী বা সৌদিতে চাকরি খুঁজছেন, তাদের জন্য এই তথ্য গুরুত্বপূর্ণ। সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া প্রক্রিয়ায় নারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা ও নিয়মাবলী রয়েছে।
১. সরকারি নীতি ও উদ্যোগ:
সৌদি সরকার ‘Vision 2030’ কর্মসূচির অংশ হিসেবে নারীর শ্রমবাজারে অংশগ্রহণ বৃদ্ধি করতে উদ্যোগ নিয়েছে। এতে নারীদের জন্য সরকারি, বেসরকারি ও বিভিন্ন খাতে চাকরির সুযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।
২. নারীর জন্য জনপ্রিয় খাত:
- স্বাস্থ্যসেবা ও নার্সিং
- শিক্ষা ও প্রশিক্ষণ
- ব্যাংকিং ও ফাইন্যান্স
- হোটেল, ট্যুরিজম ও সার্ভিস খাত
- আইটি ও প্রফেশনাল সেক্টর
৩. কর্মঘণ্টা ও ছুটি:
নারী কর্মীদের জন্য সাধারণ শ্রম আইন প্রযোজ্য। দৈনিক সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজ এবং সাপ্তাহিক ৪৮ ঘণ্টার সীমা মানা হয়। ইসলামিক ও সরকারি ছুটির সময় নারীরাও পুরুষদের মতো সুবিধা পান।
৪. নিরাপদ ও সম্মানজনক পরিবেশ:
নারীদের জন্য আলাদা ও নিরাপদ কাজের পরিবেশ নিশ্চিত করতে সৌদি কোম্পানিগুলো নিয়মিত নির্দেশিকা মেনে চলে। সুরক্ষা, স্বাস্থ্য ও সমান সুযোগের বিষয়গুলো বাধ্যতামূলক।
৫. ওয়ার্ক ভিসা ও চুক্তি:
নারী শ্রমিকদেরও সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া নিশ্চিত হলে ওয়ার্ক ভিসা, চুক্তি ও ইকামা প্রক্রিয়া পুরুষদের মতোই হয়। তবে কিছু ক্ষেত্রে অভিভাবক অনুমোদন বা স্পন্সর সাপোর্ট প্রয়োজন হতে পারে।
৬. প্রশিক্ষণ ও উন্নয়ন:
নারী কর্মীদের দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সরকার ও বেসরকারি প্রতিষ্ঠান বিভিন্ন প্রশিক্ষণ কর্মসূচি চালু করেছে। এটি চাকরির যোগ্যতা ও বেতন বৃদ্ধির ক্ষেত্রে সহায়ক।
সৌদি আরবে নারীদের চাকরির সুযোগ দ্রুত বাড়ছে, তাই যারা বৈধভাবে সৌদি আরবে চাকরি পাওয়া চান, তারা নারী হিসাবে উপযুক্ত খাত এবং সরকারি নির্দেশিকা অনুসরণ করলে সহজে সফল হতে পারেন।


