
প্রারম্ভিকভাবে বলি, ফ্রান্সে অভিবাসন ও রেসিডেন্স পারমিট সংক্রান্ত নিয়মে ২০২৫ সালে বেশ বড় পরিবর্তন এসেছে — বিশেষ করে ফ্রান্সে অভিবাসনকারীদের জন্য নতুন ভিসা প্রদানে দক্ষ বিদেশি কর্মী, সেক্টর-ভিত্তিক কর্মী এবং দীর্ঘমেয়াদি রেসিডেন্সি চাইবার প্রবাসীদের জন্য। নিচে মূল বিষয়গুলো ছকে দেওয়া হলো, এরপর প্রতিটা বিষয় সম্পর্কে বিস্তারিত লেখাও দেওয়া হয়েছে।
বাংলাদেশ, ভারত, পাকিস্তান, নেপালসহ দক্ষিণ এশীয় দেশগুলোর অনেক প্রবাসী এখন ফ্রান্সে পড়াশোনা ও চাকরির সুযোগ খুঁজছেন। তাই এই আপডেট জানা তাদের জন্য সময়োপযোগী ও গুরুত্বপূর্ণ। নিচে নতুন নিয়মগুলো বিস্তারিতভাবে তুলে ধরা হলো।
১. ফ্রান্সের নতুন অভিবাসন নীতি: দক্ষ কর্মীদের অগ্রাধিকার
ফরাসি সরকার ২০২৫ সালে যে নতুন অভিবাসন আইন পাস করেছে, সেটির মূল লক্ষ্য হলো শ্রমবাজারে দক্ষ জনবল নিশ্চিত করা। দেশটির অনেক সেক্টরে (যেমন স্বাস্থ্য, নির্মাণ, হসপিটালিটি, কৃষি ও আইটি) স্থানীয় কর্মীর ঘাটতি দেখা দিয়েছে।
এই কারণেই “immigration choisie” বা “selective immigration” নীতি চালু হয়েছে। এই নীতিতে ফ্রান্সের নিয়োগকর্তারা বিদেশি কর্মীদের সহজে নিয়োগ দিতে পারবেন, যদি প্রার্থী তার পেশাগত যোগ্যতা, শিক্ষাগত সার্টিফিকেট ও অভিজ্ঞতা দেখাতে পারেন।
এর ফলে দক্ষ বাংলাদেশি কর্মীরা—বিশেষ করে ডাক্তার, নার্স, ইঞ্জিনিয়ার, শেফ, এবং আইটি-বিশেষজ্ঞরা—এখন ফরাসি ওয়ার্ক ভিসার জন্য সহজে আবেদন করতে পারবেন।
Passeport Talent বা ট্যালেন্ট পারমিটে নতুন বিভাগ
ফ্রান্সে দীর্ঘদিন ধরে চালু আছে “Passeport Talent” নামে একটি বিশেষ পারমিট, যা উদ্যোক্তা, গবেষক, শিল্পী, এবং উচ্চ-দক্ষ কর্মীদের জন্য তৈরি।
২০২৫ সালের আপডেটে এই পারমিটের আওতায় কিছু নতুন বিভাগ যুক্ত হয়েছে — যেমন স্বাস্থ্যখাতের পেশাজীবী (চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ) এবং উদ্ভাবনী স্টার্টআপ কর্মী।
এখন এই পারমিটের মেয়াদ সর্বোচ্চ ৪ বছর, এবং রিনিউ করা যায়। আবেদনকারীর পরিবারের সদস্যরাও “Talent-Family” ভিসার মাধ্যমে একসাথে ফ্রান্সে থাকতে পারেন।
এটি বাংলাদেশের তরুণ উদ্যোক্তা বা উচ্চশিক্ষিত পেশাজীবীদের জন্যও একটি কার্যকর পথ হতে পারে।
রেসিডেন্স পারমিট নবায়ন ও স্থায়ী বসবাস
ফ্রান্সে সাধারণত তিন ধরণের রেসিডেন্স কার্ড দেওয়া হয়:
* অস্থায়ী কার্ড (১ বছর)
* বহু-বছরের কার্ড (২–৪ বছর)
* স্থায়ী রেসিডেন্স কার্ড (১০ বছর বা অনির্দিষ্টকাল)
নতুন আইনে একই ধরনের কার্ড বারবার রিনিউ করা সীমিত করা হয়েছে। এর পরিবর্তে, প্রবাসীরা যেন দ্রুত “multi-year permit” বা “permanent residence”-এর দিকে যেতে পারেন, সেই ব্যবস্থা রাখা হয়েছে।
কর, স্বাস্থ্যবীমা ও সামাজিক সুবিধা
ফ্রান্সে দীর্ঘমেয়াদি বসবাসকারীরা সরকারি স্বাস্থ্যবীমা (PUMA) সুবিধা পান। নতুন নিয়মে এর আবেদন-প্রক্রিয়া আরও দ্রুত করা হয়েছে।
তবে রেসিডেন্স কার্ড নবায়নের সময় স্বাস্থ্যবীমা কভারেজ ও ট্যাক্স রেকর্ড জমা দেওয়া এখন বাধ্যতামূলক।
বাংলাদেশি প্রবাসীদের জন্য পরামর্শ — কাজ শুরু করার সাথে সাথে “sécurité sociale” নম্বর সংগ্রহ করে বীমায় অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান, তাহলে ভবিষ্যতে রেসিডেন্স নবায়নে সমস্যা হবে না।
ফ্রান্সে অভিবাসনকারীদের জন্য নতুন ভিসা নিয়মে মূল পরিবর্তনগুলোর সারাংশ
• EU Blue Card-এর জন্য এখন কম সময়ের চুক্তি (৬ মাস) ও কিছু ক্ষেত্রে সহজকরণ হয়েছে। ([Centuro Global][1])
• Passeport Talent বা ‘ট্যালেন্ট’ পারমিট ফরম্যাটে মিশ্রণ ও সেক্টরভিত্তিক নতুন ক্যাটাগরি চালু হয়েছে (যেমন চিকিৎসা/ফার্মাসি)। ([Fragomen][2])
• রেসিডেন্স পারমিটের ভাষাগত কন্ডিশন কঠোর হচ্ছে — বহু ক্ষেত্রে ফরাসি ভাষার A2 বা ওপরের স্তর অনিবার্য হয়ে উঠছে। ([Eres Relocation Services][3])
• সাধারণ কার্ড/ভিসার রিনিউয়াল-প্রক্রিয়া, অস্থায়ী কার্ডের সীমাবদ্ধতা ও খাতভিত্তিক সুসংহত রেগুলেশন আরোপ করা হয়েছে। ([Fragomen][4])
• “তানময়” (tension) বা কর্মীর ঘাটতি দেখা দিয়েছিল এমন সেক্টরগুলোর জন্য রেগুলারাইজেশন বা বিশেষ পারমিট সহজ করা হয়েছে। ([Service Public][5])
এখন বিস্তারিতভাবে বিষয়গুলো আলোচনা করা যাচ্ছে:
1. দক্ষ কর্মী-অনুপ্রবেশ ও ট্যালেন্ট পারমিট
ফ্রান্স এখন বিদেশি দক্ষ পেশাজীবীদের আকৃষ্ট করার দিকে আগ্রহ দেখাচ্ছে। উদাহরণস্বরূপ, EU Blue Card-এর জন্য ২০২৫ সালের নতুন নিয়ম অনুযায়ী আগে যেসব চুক্তির মেয়াদ ছিল এক বছর, এখন তা **ছয় মাসের চুক্তি**-যুক্ত কোম্পানি নিয়োগের ক্ষেত্রেও গ্রহণযোগ্য হবে। ([Erickson Immigration Group][6])
তার পাশাপাশি, “ট্যালেন্ট” ক্যাটাগরির অধীনে চিকিৎসক, ফার্মাসিস্ট, মিডওয়াইফ-আদির জন্য একটি নতুন পারমিট চালু হয়েছে যা চার বছর মেয়াদী এবং রিনিউযোগ্য। ([Fragomen][2])
এ ধরনের নিয়ম পরিবর্তন বাংলা ভাষাভাষী প্রবাসীদের জন্য বড় সুযোগ এনে দিতে পারে — যেমন আপনি যদি ফ্রান্সে উচ্চশিক্ষা বা বিশেষ পেশায় যাচ্ছেন, তাহলে এই চ্যানেল একবার খতিয়ে দেখে নেওয়া ভালো।
2. ভাষাগত ও সংহতকরণ শর্ত
ফ্রান্স সরকার মনে করছে যে ফ্রান্সে অভিবাসনকারীদের জন্য নতুন ভিসা শুধুই কাজ না, স্থানীয়ভাবে সংহত হওয়াও জরুরি। তাই ২০২৬ সাল থেকে বেশকিছু ক্ষেত্রে **ফরাসি ভাষার A2 স্তর** প্রমাণ বাধ্যতামূলক করা হয়েছে দীর্ঘমেয়াদি রেসিডেন্স পারমিটের জন্য। ([Centuro Global][1])
আর নাগরিকত্ব বা ১০ বছর মেয়াদী কার্ডের জন্য ভাষার মান B1–এ নিয়ে যাওয়া হয়েছে। ([Eres Relocation Services][3])
এ কারণে আপনার ক্ষেত্রে যদি ফ্রান্সে স্থায়ীভাবে বসবাসের পরিকল্পনা থাকে, তাহলে এখন থেকে ভাষা শেখা ও সংশ্লিষ্ট প্রশিক্ষণে সময় দেওয়া জরুরি।
3. রেসিডেন্স কার্ড রিনিউয়াল ও সীমাবদ্ধতা
আগে অস্থায়ী পারমিট (এক বা দুই বছরের কার্ড) অনির্দিষ্টভাবে রিনিউ করা যেত, কিন্তু নতুন নিয়ম অনুসারে একই ধরনের কার্ড একাধিকবার রিনিউ করা সীমাবদ্ধ করা হয়েছে। ([Fragomen][4])
এ-ছাড়া, “কর্মীর ঘাটতি” দেখা দেওয়া কয়েকটি ক্ষেত্রে যারা ইতিমধ্যে ফ্রান্সে কাজ করছেন, তাদের জন্য সহজ রেগুলারাইজেশন হিসেবে এক-বছরের “টেম্পোরারি ওয়ার্কার” কার্ড চালু হয়েছে। ([Service Public][5])
এই পরিবর্তনগুলোর মানে হলো — যদি আপনি একটি সাধারণ স্বল্প মেয়াদী ভিসা বা পারমিটে রয়েছেন, তাহলে দ্রুত কাজে নামা, নিয়ম অনুযায়ী রিনিউয়াল করা এবং ভবিষ্যতের পরিকল্পনায় “মাল্টি-ইয়ার পারমিট” বা স্থায়ীভাবে যাওয়ার রাস্তা খোঁজা জরুরি।
4. কার্যকর পরামর্শ বাংলাভাষী প্রবাসীদের জন্য
• আপনার পেশাগত অভিজ্ঞতা, শিক্ষাগত যোগ্যতা, চাকরির চুক্তি ইত্যাদি ভালোভাবে সাজিয়ে রাখুন — বিশেষ করে যদি তা “ট্যালেন্ট” ক্যাটাগরিতে ফিট করে।
• ফরাসি ভাষা শেখা এখন শুধুই অতিরিক্ত বিষয় নয়— এটি একটি প্রয়োজন হয়ে উঠছে। অনলাইন কোর্স বা স্থানীয় ভাষা স্কুল খুঁজে শুরু করুন।
• ফ্রান্সে কাজ বা বসবাস শুরু করার আগে সংশ্লিষ্ট ভিডিও বা সরকারি ওয়েবসাইট থেকে সর্বশেষ নিয়মাবলী যাচাই করুন। যেমন French Office for Immigration and Integration (OFII) বা Préfecture-র নিয়ম।
• স্থায়ী পরিকল্পনা থাকলে — এক বা দুই বছরের কার্ডে আটকে না থেকে এক-চেয়ে দীর্ঘ মেয়াদী পারমিট বা রেসিডেন্স কার্ডের দিকে লক্ষ্য রাখুন।
• ব্যবসায়ী, উদ্যোক্তা বা ইনোভেটিভ কোম্পানির সঙ্গে যুক্ত হলে “ট্যালেন্ট–প্রজেক্ট হোল্ডার” ক্যাটাগরিও বিবেচনায় নিয়ে দেখুন।
ফ্রান্সে অভিবাসনকারীদের জন্য নতুন ভিসা ও ফ্রান্সে রেসিডেন্স পারমিট সংক্রান্ত নিয়ম ২০২৫ সালে পরিবর্তনের মুখে, কিন্তু সেগুলো ঠিকভাবে বুঝে ও সময়মতো পদক্ষেপ নিলে ভিসা-ডকুমেন্টেশনের ঝামেলা কম হবে, সফলভাবে বসবাস বা কর্মজীবন গড়ার সম্ভাবনা বাড়বে। আপনার জন্য এই তথ্য হয়ে উঠুক সহায়ক, যেন আপনি বা আপনার পরিচিতা প্রবাসীরা ফ্রান্স-ভিত্তিক পরিকল্পনায় নির্ভয়ে এগুতে পারেন।
