
কুয়েতে নতুন মাদক আইন মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণে ইতিহাসের সবচেয়ে কঠোর আইন কার্যকর হতে যাচ্ছে। ২০২৫ সালের কুয়েতে নতুন মাদক আইন অনুযায়ী, যারা মাদক পাচার বা বিতরণের সঙ্গে জড়িত থাকবে, তাদের জন্য মৃত্যুদণ্ড এবং সর্বোচ্চ ২০ লক্ষ কুয়েতি দিনার পর্যন্ত জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। সরকার বলছে, এই কঠোর আইন সমাজকে “মাদক মহামারি” থেকে রক্ষা করবে এবং আন্তর্জাতিক পাচারচক্রের শিকড় উপড়ে ফেলবে।
কুয়েত সরকার এই নতুন আইনটি তৈরি করেছে ১৯৮৩ সালের আইন নং ৭৪ এবং ১৯৮৭ সালের ডিক্রি–আইন নং ৪৮ একত্র করে। দীর্ঘ চার দশক পর দেশের মাদক আইন পুরোপুরি সংস্কার করা হলো, যাতে আর কোনো আইনি ফাঁকফোকর না থাকে এবং আদালতগুলো দ্রুত রায় দিতে পারে।
নতুন আইনের মূল বৈশিষ্ট্য ও পরিবর্তনসমূহ
১. মাদক পাচারের জন্য মৃত্যুদণ্ড
কুয়েতে নতুন মাদক আইনব আইনে সবচেয়ে বড় পরিবর্তন হলো মৃত্যুদণ্ডের সংযোজন। মাদক পাচার, আন্তর্জাতিক চোরাচালান, কারাগারে মাদক প্রবেশ করানো বা সংগঠিতভাবে মাদক বিক্রির মতো অপরাধ এখন সরাসরি মৃত্যুদণ্ডের আওতায় পড়বে।
যদি কেউ সরকারি কর্মকর্তা হিসেবে নিজের পদ ব্যবহার করে এমন অপরাধে জড়িত থাকে, তার ক্ষেত্রেও মৃত্যুদণ্ড প্রযোজ্য হবে। কুয়েত সরকার জানিয়েছে, “মাদক ব্যবসায়ীদের জন্য কোনো দয়া বা ছাড় নেই।”
২. বিশাল অঙ্কের জরিমানা
আগের কুয়েতে মাদক আইন সর্বোচ্চ জরিমানা ছিল তুলনামূলক কম। কিন্তু কুয়েতে নতুন মাদক আইন জরিমানার পরিমাণ এতটাই বেড়েছে যে এখন তা সর্বোচ্চ ২০ লক্ষ কুয়েতি দিনার পর্যন্ত হতে পারে — যা বাংলাদেশি টাকায় প্রায় ৭ কোটি টাকার সমান।
মাদক কেনা, বিক্রি, বা সংরক্ষণের মতো অপরাধে আদালত এখন ইচ্ছানুযায়ী জরিমানা ও জেল দুই-ই দিতে পারবে।
৩. বাধ্যতামূলক ড্রাগ টেস্ট
নতুন আইনের অন্যতম আলোচিত অংশ হলো বাধ্যতামূলক ড্রাগ টেস্ট। এখন থেকে নিম্নোক্ত ক্ষেত্রগুলোতে নাগরিক ও প্রবাসীদের ড্রাগ টেস্ট দিতে হবে:
- ড্রাইভিং লাইসেন্স আবেদন বা নবায়ন
- বিবাহ নিবন্ধন বা লাইসেন্স
- সরকারি চাকরিতে আবেদন
- সামরিক ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীতে নিয়োগ
- স্কুল, কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী
যদি কেউ কোনো বৈধ কারণ ছাড়া ড্রাগ টেস্ট দিতে অস্বীকার করেন, তবে তার বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া হবে — জরিমানা এবং সর্বোচ্চ তিন বছরের কারাদণ্ড পর্যন্ত হতে পারে।
৪. ব্যবহারকারীর আশেপাশে থাকলেও অপরাধ
কুয়েতে নতুন মাদক আইন শুধু মাদক ব্যবহারকারীকেই নয়, তার আশেপাশে যারা থাকে বা তাকে সহযোগিতা করে, তাদেরও অপরাধী ধরা হবে। উদাহরণস্বরূপ — যদি কেউ এমন একটি ঘরে উপস্থিত থাকে যেখানে অন্য কেউ মাদক সেবন করছে, তাহলে তাকেও অভিযুক্ত করা হতে পারে।
এছাড়া, যারা বিনামূল্যে মাদক সরবরাহ করে বা অন্যকে মাদক সেবনে উৎসাহ দেয়, তারাও কঠোর শাস্তির মুখে পড়বে।
৫. দ্রুত বিচার ও রায় কার্যকর
পূর্বে মাদক মামলার বিচার অনেক বছর ধরে ঝুলে থাকত। নতুন আইনে বলা হয়েছে, আদালতের রায় দ্রুত কার্যকর করতে হবে। এর মাধ্যমে বিচার ব্যবস্থার বিলম্ব কমবে এবং অপরাধীরা দ্রুত শাস্তি পাবে।
প্রবাসীদের জন্য এই আইন কতটা গুরুত্বপূর্ণ

কুয়েতে প্রায় ৪০ লাখেরও বেশি প্রবাসী কাজ করেন, যার মধ্যে বড় অংশ দক্ষিণ এশিয়ার — বাংলাদেশ, ভারত ও ফিলিপাইনের নাগরিক। নতুন আইনে প্রবাসীদের জন্য ঝুঁকি আরও বেড়েছে, কারণ সামান্য অসতর্কতায়ও ভয়াবহ পরিণতি হতে পারে।
১. অজান্তে মাদক রাখা বা বহন করাও অপরাধ
কুয়েত বিমানবন্দর বা সীমান্তে যদি কারও ব্যাগে সামান্য পরিমাণ মাদক পাওয়া যায়, সেটিও গুরুতর অপরাধ হিসেবে গণ্য হবে। কেউ যদি বলে “আমি জানতাম না”, তবুও সেটা আইনত গ্রহণযোগ্য অজুহাত নয়।
২. বন্ধুর সঙ্গে মাদক ব্যবহারকারীর সংস্পর্শে থাকলে
নতুন আইনে বলা হয়েছে, কেউ যদি জানে তার কোনো বন্ধু বা সহকর্মী মাদক ব্যবহার করছে, তবুও তার কাছাকাছি থাকে বা সঙ্গ দেয় — সেটিও শাস্তিযোগ্য অপরাধ। তাই সতর্ক থাকা জরুরি।
৩. প্রেসক্রিপশন ওষুধে সতর্কতা
অনেক প্রবাসী দেশে বা অনলাইনে এমন ওষুধ নিয়ে আসে যা কুয়েতে নিষিদ্ধ। যেমন — কিছু ঘুমের ওষুধ, মানসিক চিকিৎসার ট্যাবলেট বা ব্যথানাশক। এগুলো প্রেসক্রিপশন ছাড়া নিজের কাছে রাখলে সেটিও মাদক অপরাধ হিসেবে ধরা হতে পারে।
৪. প্রবাসী কর্মীদের জন্য অতিরিক্ত ঝুঁকি
হাসপাতাল, রেস্টুরেন্ট, ট্যাক্সি, কনস্ট্রাকশন কোম্পানি বা গৃহকর্মী হিসেবে যারা কাজ করেন, তাদের উপর এখন আরও কঠোর নজরদারি হবে। এলোমেলোভাবে পুলিশ বা কর্তৃপক্ষ ড্রাগ টেস্ট নিতে পারে। ফলাফল পজিটিভ হলে সঙ্গে সঙ্গে চাকরি বাতিল, ডিপোর্টেশন বা জেল হতে পারে।
৫. ডিপোর্টেশনের আগে শাস্তি
আগে অনেক সময় প্রবাসীদের মাদক মামলায় ধরা হলে সরাসরি দেশে পাঠিয়ে দেওয়া হতো। এখন নতুন আইনে বলা হয়েছে, অপরাধ প্রমাণিত হলে ডিপোর্টেশনের আগে কুয়েতে শাস্তি কার্যকর করতে হবে। অর্থাৎ কারাদণ্ড বা জরিমানার পরই কেউ দেশে ফিরতে পারবে।
কেন কুয়েতে নতুন মাদক আইন আনা হলো

কুয়েত সরকার জানিয়েছে, দেশে মাদক সংক্রান্ত অপরাধ ও মৃত্যুর সংখ্যা দ্রুত বেড়েছে। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে পুলিশ শত শত কেজি মাদক জব্দ করেছে এবং বহু আন্তর্জাতিক চক্রের সদস্যকে গ্রেফতার করেছে। সরকারের মতে, “মাদক ব্যবসা এখন জাতীয় নিরাপত্তার জন্য হুমকি।”
তারা আরও বলেছে, পুরোনো আইনগুলো দুর্বল এবং কিছু অপরাধী আইনের ফাঁকফোকর ব্যবহার করে রেহাই পেত। নতুন আইন তাই আরও শক্তিশালী এবং কঠোর শাস্তির ব্যবস্থা করেছে, যাতে কেউ মাদক ব্যবসায় জড়ানোর সাহস না পায়।
বিশেষ সতর্কতা প্রবাসীদের জন্য
- কখনোই কোনো অপরিচিত ব্যক্তির কাছ থেকে ব্যাগ, প্যাকেট বা জিনিস নেবেন না, বিশেষ করে বিমানবন্দরে।
- বন্ধুর কাছেও যদি এমন কিছু থাকে যা সন্দেহজনক মনে হয়, তার কাছাকাছি থাকবেন না।
- প্রেসক্রিপশন ওষুধ সবসময় ডাক্তারের লিখিত কাগজসহ রাখুন।
- সরকারি বা বেসরকারি চাকরির আগে ড্রাগ টেস্টে অংশ নিতে প্রস্তুত থাকুন।
- পুলিশি অভিযানে সহযোগিতা করুন এবং আইন ভঙ্গের আশঙ্কা থাকলে দূরে থাকুন।
এই আইন প্রবাসীদের জীবনে কী প্রভাব ফেলবে
নতুন আইনের ফলে প্রবাসী সমাজে ভয় ও সচেতনতা দুটোই বাড়বে।
কুয়েতে অনেক প্রবাসী ভুল করে বা অন্যের প্ররোচনায় ছোটখাটো অপরাধে জড়িয়ে পড়ে, যা এখন জীবন-মৃত্যুর প্রশ্ন হয়ে দাঁড়াতে পারে।
আইনের কড়াকড়ি বৃদ্ধির ফলে চাকরির আবেদন, ভিসা নবায়ন, বা লাইসেন্সের প্রক্রিয়ায় অতিরিক্ত যাচাই করা হবে। অনেক কোম্পানি নিজ উদ্যোগে কর্মীদের ড্রাগ টেস্ট করাবে, যাতে কেউ ঝুঁকিপূর্ণ না হয়।
সরকারের বার্তা
কুয়েতের স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এক বিবৃতিতে বলেছেন, “আমাদের সমাজে মাদকের কোনো স্থান নেই। যারা এই অপরাধে যুক্ত, তাদের জন্য একটাই বার্তা — মৃত্যুদণ্ড।”
সরকার চাইছে, নতুন আইন কার্যকর হবার পর মাদক ব্যবসা পুরোপুরি নির্মূল হোক এবং প্রবাসীরাও যেন সচেতন থাকে।
সংক্ষেপে এক নজরে
- মাদক পাচার বা চোরাচালান = মৃত্যুদণ্ড
- মাদক রাখা, ব্যবহার বা বিক্রি = কারাদণ্ড + জরিমানা
- মাদক পরীক্ষায় অস্বীকৃতি = জেল + জরিমানা
- মাদক ব্যবহারকারীর সঙ্গেও শাস্তি
- সরকারি চাকরি বা বিবাহ নিবন্ধনে বাধ্যতামূলক ড্রাগ টেস্ট
শেষ কথা
কুয়েতের এই নতুন মাদক আইন শুধু অপরাধীদের জন্য নয়, সাধারণ প্রবাসীদের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। কেউ যদি অজান্তেও এই আইনের লঙ্ঘন করে, তাহলে ফলাফল হতে পারে মারাত্মক।
তাই প্রবাসী জীবনে আইন জানা, সচেতন থাকা এবং অন্যের প্রলোভনে না পড়াই এখন সবচেয়ে বড় নিরাপত্তা।



