
২০২৫ সালে পর্তুগালে কাজের সুযোগ আরও বেড়েছে। ইউরোপীয় ইউনিয়নের শ্রম সংকট মোকাবিলায় দেশটি দক্ষিণ এশিয়া ও আফ্রিকার দেশগুলোর নাগরিকদের জন্য বিভিন্ন সেক্টরে কর্মসংস্থানের পথ খুলে দিয়েছে। পর্তুগাল সরকারের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে নির্মাণ, হোটেল–রেস্তোরাঁ, কৃষি, গৃহপরিচারিকা, ড্রাইভার, বয়স্কদের যত্ন (caregiver) এবং তথ্যপ্রযুক্তি (IT) খাতে সবচেয়ে বেশি বিদেশি কর্মী নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে।
ইউরোপের দক্ষিণ-পশ্চিমে অবস্থিত সুন্দর দেশ পর্তুগাল এখন ইউরোপে বসবাস ও কাজ করতে আগ্রহী প্রবাসীদের জন্য পর্তুগালে কাজের সুযোগ অন্যতম আকর্ষণীয় গন্তব্য। সাশ্রয়ী জীবনযাপন, নিরাপদ পরিবেশ, মনোরম আবহাওয়া এবং বিভিন্ন সেক্টরে বিদেশিদের জন্য খোলা চাকরির বাজারের কারণে বাংলাদেশ, ভারত, নেপালসহ অনেক দেশের নাগরিক এখানে কাজের সুযোগ খুঁজে নিচ্ছেন। আজকের এই লেখায় আমরা জানব—পর্তুগালে কাজের সুযোগ, ভিসার ধরণ ও আবেদন প্রক্রিয়া, প্রয়োজনীয় যোগ্যতা এবং গড় বেতন সম্পর্কে বিস্তারিত।
পর্তুগালে কাজের সুযোগ ২০২৫ সালে
প্রধান কর্মসংস্থানের সেক্টরসমূহ
- নির্মাণ ও মেইন্টেনেন্স
- হোটেল, রেস্টুরেন্ট ও ট্যুরিজম
- কৃষি ও ফল সংগ্রহের মৌসুমি কাজ
- গৃহকর্মী ও পরিচর্যা সেবা
- পরিবহন ও ড্রাইভার পেশা
- আইটি, ডিজিটাল মার্কেটিং, প্রোগ্রামিং
- স্বাস্থ্যসেবা ও কেয়ারগিভার
এই সেক্টরগুলোতে কাজের চাহিদা বেশি, বিশেষ করে লিসবন, পোর্তো, আলগার্ভ এবং সেতুবাল অঞ্চলে। মৌসুমি ও স্থায়ী উভয় ধরণের চাকরির সুযোগ রয়েছে।
পর্তুগালে কাজের ভিসার ধরন
বাংলাদেশি নাগরিকদের পর্তুগালে কাজ করতে হলে প্রথমে কাজের ভিসা (Work Visa) নিতে হয়। মূলত তিন ধরণের ভিসা সবচেয়ে প্রচলিত—
- Employment Visa (Long-Term Work Visa) – স্থায়ী চাকরির জন্য।
- Seasonal Work Visa – কৃষি বা পর্যটন মৌসুমে অল্প সময়ের জন্য কাজ করতে ইচ্ছুকদের জন্য।
- Job Seeker Visa (New in 2025) – নতুন সংযোজন, যা আবেদনকারীকে ৬ মাস পর্তুগালে থেকে চাকরি খোঁজার অনুমতি দেয়।
পর্তুগালের কাজের ভিসার জন্য প্রয়োজনীয় যোগ্যতা
কাজের ভিসার জন্য আবেদন করতে হলে কিছু নির্দিষ্ট যোগ্যতা ও নথিপত্র প্রয়োজন হয়। এগুলোর মধ্যে রয়েছে—
- বৈধ পাসপোর্ট (কমপক্ষে ৬ মাসের মেয়াদসহ)
- পর্তুগালে নিবন্ধিত কোনো কোম্পানির চাকরির অফার লেটার বা চুক্তিপত্র
- পুলিশ ক্লিয়ারেন্স সার্টিফিকেট
- স্বাস্থ্য পরীক্ষা ও মেডিকেল ইন্স্যুরেন্স
- শিক্ষাগত যোগ্যতার প্রমাণপত্র (যদি প্রয়োজন হয়)
- ব্যাংক স্টেটমেন্ট (ন্যূনতম জীবনযাপনের জন্য অর্থের প্রমাণ)
- ভিসা ফি জমার রসিদ
আবেদন প্রক্রিয়া
- পর্তুগালের কোনো কোম্পানি থেকে চাকরির অফার সংগ্রহ করুন।
- কোম্পানি কর্তৃপক্ষ পর্তুগালের শ্রম অফিসে অনুমোদনের জন্য আবেদন করবে।
- অনুমোদন পাওয়ার পর বাংলাদেশে অবস্থিত পর্তুগিজ দূতাবাস বা VFS Global-এর মাধ্যমে ভিসার আবেদন জমা দিতে হবে।
- সবকিছু ঠিক থাকলে আবেদনকারীকে লং-টার্ম ভিসা প্রদান করা হয়।
- পর্তুগালে পৌঁছানোর পর স্থানীয় অভিবাসন দপ্তর (SEF)-এ গিয়ে রেসিডেন্স পারমিট সংগ্রহ করতে হয়।
রেসিডেন্স পারমিট ও স্থায়ী বসবাস
প্রথমে সাধারণত এক বছরের রেসিডেন্স পারমিট দেওয়া হয়, যা পরবর্তীতে নবায়নযোগ্য। পর্তুগালে টানা ৫ বছর বৈধভাবে বসবাস ও ট্যাক্স প্রদান করলে স্থায়ী রেসিডেন্স (Permanent Residence) ও পরে নাগরিকত্বের জন্য আবেদন করা যায়।
পর্তুগালে গড় বেতন
পর্তুগালে গড় মাসিক বেতন পেশাভেদে ভিন্ন। ২০২৫ সালের হিসাবে পর্তুগালের ন্যূনতম মজুরি ৯৬০ ইউরো (প্রায় ১,১৫,০০০ টাকা)।

নিচে বিভিন্ন পেশার আনুমানিক বেতনের তালিকা দেওয়া হলো—
- নির্মাণ শ্রমিক: ১,০০০–১,৩০০ ইউরো
- রেস্টুরেন্ট কর্মী: ৯৫০–১,২০০ ইউরো
- হাউজকিপার/গৃহকর্মী: ৯০০–১,১০০ ইউরো
- কৃষি শ্রমিক (মৌসুমি): ৮৫০–১,০০০ ইউরো
- ড্রাইভার: ১,২০০–১,৫০০ ইউরো
- কেয়ারগিভার: ১,০০০–১,৩০০ ইউরো
- আইটি পেশাজীবী: ১,৮০০–২,৫০০ ইউরো
অতিরিক্ত সময় (Overtime) বা সপ্তাহান্তে কাজ করলে বাড়তি পারিশ্রমিকও পাওয়া যায়।
পর্তুগালে জীবনযাপন ও খরচ
পর্তুগালে জীবনযাত্রার ব্যয় ইউরোপের অন্যান্য দেশের তুলনায় তুলনামূলকভাবে কম। গড়ে একজন অবিবাহিত ব্যক্তির মাসিক খরচ (বাসা ভাড়া ছাড়া) ৫০০–৬০০ ইউরো।
- রুম ভাড়া (শেয়ারড): ২৫০–৪০০ ইউরো
- খাবার ও বাজার: ২০০–২৫০ ইউরো
- পরিবহন ও ইউটিলিটি বিল: ৮০–১০০ ইউরো
- মোবাইল ও ইন্টারনেট: ২০–৩০ ইউরো
পর্তুগালের মানুষ অতিথিপরায়ণ এবং বিদেশিদের প্রতি সহনশীল। ইংরেজি ভাষা জানলে প্রাথমিকভাবে কাজের জায়গায় যোগাযোগ করা সহজ হয়।
কাজের পাশাপাশি অধিকার ও সুরক্ষা
পর্তুগাল সরকার বিদেশি শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় বেশ সক্রিয়। শ্রম আইন অনুযায়ী প্রতিদিন সর্বোচ্চ ৮ ঘণ্টা কাজের নিয়ম, সপ্তাহে ১ দিন ছুটি, এবং বেতনসহ ছুটি দেওয়ার বাধ্যবাধকতা রয়েছে।
যে কোনো প্রবাসী কর্মী পর্তুগালে বৈধভাবে কাজ করলে স্বাস্থ্যসেবা (SNS), সামাজিক সুরক্ষা (Social Security) ও পেনশন সুবিধা পাওয়ার অধিকার রাখেন।
কেন পর্তুগালে কাজ করা ভালো সিদ্ধান্ত
- ইউরোপীয় ইউনিয়নের নিরাপদ দেশ
- স্থায়ী বসবাস ও নাগরিকত্বের সুযোগ
- তুলনামূলক কম খরচে জীবনযাপন
- পরিবারসহ থাকার সুযোগ
- উচ্চমানের স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষা সুবিধা
সতর্কতা ও পরামর্শ
- কাজের অফার পাওয়ার আগে কখনও অগ্রিম টাকা পাঠাবেন না।
- শুধুমাত্র অনুমোদিত রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে চুক্তি করুন।
- পর্তুগালে পৌঁছে অবৈধভাবে কাজ বা রেসিডেন্স নবায়ন না করলে বড় ধরনের জরিমানা ও ডিপোর্টেশনের ঝুঁকি থাকে।
- SEF (Serviço de Estrangeiros e Fronteiras) ওয়েবসাইটে সর্বশেষ আপডেট নিয়ম নিয়মিত চেক করুন।
পর্তুগাল আজ ইউরোপে বিদেশি কর্মীদের জন্য নতুন সুযোগের দেশ। যারা পরিশ্রমী, দক্ষ এবং আইনি প্রক্রিয়া মেনে কাজ করতে আগ্রহী, তাদের জন্য পর্তুগাল হতে পারে স্থায়ী জীবনের একটি নতুন অধ্যায়। কাজের পাশাপাশি এখানে পরিবারসহ সুন্দর জীবনযাপন সম্ভব — যদি সব কিছু নিয়ম মেনে করা হয়।


